Author: rayanirban39

  • দাসপুরের প্রাচীন মন্দির: ঐতিহ্য ইতিহাস

    দাসপুরের প্রাচীন মন্দির: ঐতিহ্য ইতিহাস

    দাসপুর মন্দিরের দেশ।দাসপুরের প্রথম আঞ্চলিক ইতিহাসকার পরিব্রাজক পঞ্চানন রায় কাব্যতীর্থ আজ থেকে প্রায় ৭০ বছর আগে তাঁর দাসপুরের ইতিহাস [ ১৩৬৫ ]গ্রন্থে লিখেছেন,দাসপুরে মন্দিরের সংখ্যা প্রায় দু হাজারের কাছাকাছি।” এখন অবশ্য সেই সব মন্দিরের অধিকাংশ ই কালের করাল গ্রাসে ভগ্ন পরিত্যক্ত এবং নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।অবশ্য এখনও বেশ কিছু প্রাচীন মন্দির রয়েছে,আজ সেগুলো নিয়েই সংক্ষিপ্ত আলোচনা।
    দাসপুরের মন্দির গুলো বিভিন্ন শিল্প রীতির।একরত্ন বা আলগোছটুঙ্গী,পঞ্চরত্ন, নবরত্ন, চাঁদনী, দোচালা,চারচালা,আটচাল বিশিষ্ট এবং বারচাল বিশিষ্ট মন্দির এমনকি জোড়বাংলা মন্দির ও আছে দাসপুরে। জোড়বাংলা মন্দির টি ও ভগ্ন।এটি রাণীচকের মন্ডল অধিকারীদের।এটি প্রায় চারশো বছরের প্রাচীন। প্রাচীন মন্দির গুলোর মধ্যে নিমতলার হেমন্তনগরের রাজা [ রাজা শোভাসিংহের ভ্রাতা] হিম্মৎ সিংহ প্রতিষ্ঠিত হেমন্ত নাথ মন্দির [ বর্তমান ধ্বংসপ্রাপ্ত] এবং বাসুদেবপুর পুরের চক্রবর্তী বংশের পরিত্যক্ত [বর্তমান নবকলেবরে]রণ রামের মন্দির প্রাচীন পরিত্যক্ত ও ধ্বংস প্রাপ্ত মন্দিরগুলোর অন্যতম।
    বর্তমানে যে কয়েকটি প্রাচীন মন্দির দাসপুরের ঐতিহ্য ইতিহাস নিয়ে এখনও বর্তমান সেগুলোর মধ্যে প্রথমেই উল্লেখ করতে হবে দাসপুরের সিংহদের গোপীনাথের একরত্ন মন্দির।এটির প্রতিষ্ঠাকাল ১৭১৬ খ্রীষ্টাব্দ। সামনের পোড়ামাটির লিপি ফলকে ” শ্রী শকাব্দা ১৬৩৮ সন ১১২৩ সাল” লেখা আছে। প্রচুর টেরাকোটা সমৃদ্ধ মন্দির।হুকাপানরত জমিদারের ঝাম্পানে গমন, শিকার দৃশ্য,নৌযুদ্ধ, রণতরী ছাড়াও রাম রাবণের যুদ্ধ,কালীয়দমন,গোপীগণের বস্ত্র হরণ প্রভৃতি টেরাকোটা শিল্প চিত্তাকর্ষক ও প্রশংসনীয়।
    রাধাকান্তপুরের দাসবংশের গোপীনাথের একরত্ন মন্দির টিও একটি প্রাচীন মন্দির। মন্দিরের সংস্কার সাল লেখা আছে ১৮৪৪ সাল। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল এই মন্দিরের গাত্রের কার্ণিশের নীচে সুদীর্ঘ ৯ টি সারিতে মন্দির প্রতিষ্ঠার এক উজ্জ্বল ইতিহাস রয়েছে।দাসবংশের পূর্ব পুরুষ জনানন্দ দাসের জ্যেষ্ঠ পুত্র শ্যামদাসের প্রতি বিশেষ কারণে রুষ্ট হয়েছিলেন তৎকালীন চেতুয়া বরদার রাজা শোভাসিংহ।রুষ্ট হওয়ার কারণে শ্যামদাসের মুন্ডচ্ছেদন হয় এবং কর্তিত মুন্ড দুর্গা নাম উচ্চারণ করলে রাজা বিস্ময়াভিভূত হন। লিপি তে বর্ণিত এই ইতিহাস সর্বপ্রথম তুলে ধরেণ আঞ্চলিক ইতিহাসকার পঞ্চানন রায় কাব্যতীর্থ এবং আজ থেকে সত্তর বছর আগে প্রকাশিত দাসপুরের ইতিহাস গ্রন্থে লিপিটি পাঠোদ্ধার করে প্রকাশ করেন। পঞ্চানন রায় কাব্যতীর্থ এবং প্রণব রায় লিখিত ” ঘাটালের কথা” গ্রন্থের [১৯৭৭ ] ২৫০-৫১ পৃষ্ঠাতেও লিপি টি পাঠোদ্ধার করে মুদ্রিত হয়েছে। মন্দিরটির সংস্কার সাল লেখা আছে ১৮৪৪ । প্রতিষ্ঠাকাল সম্পর্কে লেখা আছে লিপিতে
    “হইল দু শতেক বৎসর” অর্থাৎ লিপি অনুযায়ী ১৬৪৪ সাল হওয়ার কথা। কিন্তু শোভা সিংহ এর রাজত্ব কাল ১৬৬৫ থেকে ১৬৯৫/৯৬ ধরলে ,এর মধ্যে ই হতে হয়।” হইল দু শতেক” এটি সূত্রধর বা বংশের তৎকালীন কোনো পুরুষের আন্দাজ মতো একটি নির্ণেয় সাল মনে করা যেতে পারে। কিন্তু তা হলেও দাসপুরের অক্ষত মন্দির গুলোর মধ্যে এটি একটি সবথেকে পুরনো মন্দির নিঃসন্দেহে এবং একটি ইতিহাস প্রসিদ্ধ মন্দির।
    দাসপুরের চাঁইপাটের কাছে নায়েক পাড়ায় রাধাগোবিন্দের একটি মন্দির আছে।এটি ১২ চালার মন্দির। সম্ভবত এটিই দাসপুরের একমাত্র বারচালার মন্দির। এটিও একটি পুরনো মন্দির। প্রতিষ্ঠাকাল ১৭৫৯ খ্রী। রাস্তার থেকে অনেকটাই উঁচুতে। অসংখ্য টেরাকোটা সমৃদ্ধ মন্দির টি পূর্ব মুখী এবং উচ্চতা প্রায় ৪৫ ফুট।
    খেপুতের খিপ্তেশ্বরী মায়ের মন্দির টিও একটি পুরনো মন্দির। খিপ্তেশ্বরী দেবী অষ্টভুজা মহিষমর্দিনী। মন্দিরটির প্রতিষ্ঠাকাল ১৭৭৯ খ্রীষ্টাব্দ। মন্দিরটির সংস্কার চলছে।
    দাসপুরের চেঁচুয়া গোবিন্দনগরে গোস্বামী দের রাধাগোবিন্দ ও রাধারমণের পঞ্চরত্ন মন্দিরটিও একটি উল্লেখযোগ্য মন্দির।মন্দিরটি পুরাতত্ত্ব বিভাগ কর্তৃক সংরক্ষিত।বহু টাকা বরাদ্দ হয়েছে কয়েকদফায় মন্দিরটির সংস্কারের জন্য।বলা বাহুল্য ” দাসপুর” এই নামটি আমরা সর্বপ্রথম এই মন্দিরের লিপি থেকে পাই। প্রতিষ্ঠাকাল ১৭৮১ ।এই মন্দিরে অসংখ্য টেরাকোটা কাজ রয়েছে।লোকলস্কর পরিবৃত জমিদারের গমন, নীচে শিকারী কুকুর, হার্মাদ রণতরী,রামরাবণের যুদ্ধ, কৃষ্ণ লীলা প্রভৃতি। পাশেই ভোগশালা।দাসপুরের ডিয়াল চাঁইপাটে মন্ডলদের রাজ রাজেশ্বর মন্দির টি নবরত্ন মন্দির। সম্প্রতি সংস্কার হয়েছে।এই মন্দিরের সেবায়েত প্রায় ৭০টি পরিবার। প্রতিষ্ঠাকাল ১৮২৮ খ্রীষ্টাব্দ।

    খেপুতের খিপ্তেশ্বরী মা
    ডিয়াল চাঁইপাটে মন্ডলদের রাজ রাজেশ্বর মন্দির
    চুয়াড় বিদ্রোহের নেতা গোবর্ধন দিগপতি র স্মৃতি মন্দির। আমশোল

  • চুয়াড় বিদ্রোহের নেতা গোবর্ধন দিগপতির আদি বাসস্থান কোথায়?

    চুয়াড় বিদ্রোহের নেতা গোবর্ধন দিগপতির আদি বাসস্থান কোথায়?

    দাসপুরের এই বিদ্রোহী নেতার জন্মভিটের সন্ধানে গতকাল দাসপুরের গোবিন্দপুর ধানখালের কয়েকটি জায়গায় ছিলাম। সঙ্গে ছিলেন এলাকার পরিচিত শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব শ্রী সুশান্ত চক্রবর্তী মহাশয়। ছিলেন দিগপতি পরিবারের প্রবীণতম ব্যক্তি শ্রদ্ধেয় ভরতবাবু।
    ঘাটাল মহকুমার দাসপুরের ই বেশ কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব রাজা জমিদার অগ্নিযুগের বীর বিপ্লবী সহ ভূমিজদের বীরত্বের ইতিহাস গাথা রয়েছে। প্রাচীন ইতিহাসের গবেষক ও সমসময়ের কিছু কিছু ইতিহাস গবেষক লেখক এই অঞ্চলের মানুষের জীবন সংগ্রামের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করেছেন, গ্রন্থ রচনা করেছেন। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ সেই বীর বিপ্লবী ভূমিজদের দেশপ্রেম, জীবন যুদ্ধে পর্যুদস্ত হয়েও অপরিমেয় শক্তি সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ সেই বীর বিপ্লবীদের ইতিহাস অনুসন্ধান পর্যালোচনার মাধ্যমে তাদের কথা তুলে ধরেছেন।
    দাসপুরের তথা ঘাটাল মহকুমার প্রথম আঞ্চলিক ইতিহাসকার পঞ্চানন রায় তাঁর ” দাসপুরের ইতিহাস” , ঘাটালের কথা “,”বাংলার মন্দির ” সহ আঞ্চলিক ইতিহাসের নানা কথা বিভিন্ন প্রবন্ধে এবং তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করে গেছেন। প্রাচীন ইতিহাস অনুসন্ধানকারী দের কাছে কোনো দৃষ্টান্ত থাকে না। তাঁদের কাছে সবটাই অনালোচিত সবটাই অনালোকিত । সেই অনালোকিত ইতিহাসের অনুসন্ধান অন্বেষণ যাঁরা প্রথম করেন,তাঁরাই প্রধান পুরোহিত প্রথম পথিকৃৎ।
    ঘাটাল তথা দাসপুরের আঞ্চলিক ইতিহাসের প্রথম পথিকৃৎ পঞ্চানন রায় কাব্যতীর্থ গোবর্ধন দিগপতির আদি বাসস্থান নিয়ে প্রথম আলোকপাত করে জানান, উত্তর ধানখালে তাঁর জন্ম এবং আদি বাসস্থান। অনুসন্ধানে জানা গেল,এই এলাকার প্রবীণ নাগরিক প্রয়াত শিক্ষক রামপ্রসাদ চক্রবর্তীর দেয়া তথ্য অনুযায়ী এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব এবং পরিচিত শ্রদ্ধেয় শিক্ষক সুশান্ত চক্রবর্তী জানালেন, উত্তর ধানখালের বিষ্টু দোলইয়ের বর্তমান ভিটেটি গোবর্ধন দিগপতির আদি জন্মভিটে। এবং জানালেন, পঞ্চানন রায় ” ঘাটালের কথা” গ্রন্থে গোবর্ধন দিগপতির আদি বাসস্থান নিয়ে যা তথ্য লিখে গেছেন এবং এটিই সঠিক।তিনি রামপ্রসাদ চক্রবর্তীর কাছ থেকেও এই এক ই তথ্য জেনেছেন।বিষ্টু দোলই কুঞ্জপুর থেকে বৈবাহিক সূত্রে এখানে আসেন এবং রামেশ্বর দোলইয়ের কন্যাকে বিবাহ করে এখানে স্থায়ী হন। রামেশ্বর দোলইয়ের পূর্ব পুরুষ দিগপতিদের কাছ থেকে এটি পেয়েছিলেন।
    প্রসঙ্গত সুশান্ত বাবুদের উদ্যোগে চুয়াড় বিদ্রোহের এই নেতার আবক্ষ মূর্তির উন্মোচন নিয়ে মাসখানেক আগে এখানে একটি অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত ছিলাম অনুষ্ঠানের উদ্বোধক হিসেবে। ঘটনাক্রমে যাঁর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের কথা তাঁর অনুপস্থিতিতে আমাকেই ঐ কাজটি করতে হয়েছিল।এটা আমার পরম প্রাপ্তি।
    যাওয়ার পথে জোতবানী তে আমাদের এলাকা থেকে হারিয়ে যাওয়া বিরল কনকচাঁপা ফুলের গাছ দেখলাম।। অনেকটা ধুতরা ফুলের মতো দেখতে। বসন্ত কালে পলাশ শিমুলের সঙ্গে ই ফোটে। অপূর্ব শোভা রাস্তার পাশে।এও পরম প্রাপ্তি।দিগপতিদের পরিবার এখন গোবিন্দপুর মৌজার বাসিন্দা। বর্তমান বসবাসকারী সুকুমার দোলইবাবুও জানালেন তিনি জেনেছেন,এটি দিগপতিদের ভিটে ছিল এবং গোবর্ধন দিগপতি ছিলেন এই দিগপতি পরিবারের পুরুষ।